Tuesday, 29 December 2009

পটচিত্র

পট্ট শব্দ হতে পট শব্দের উত্‍পত্তি৷ পট বা কাপড়ের উপর অঙ্কিত চিত্রের স্থলে কাগজ আবিষ্কারের পর তাতে ছবি অাঁকার প্রচলন হলেও পট শব্দ চিত্র অর্থে অভিধানে স্থান পেয়েছে৷ লোকশিল্পের একটা প্রাচীন মাধ্যম 'পট'৷ বৈদিক ও বৌদ্ধ গ্রন্থাবলীতে চিত্রাঙ্কনের উলেস্নখ দেখা যায়৷ ক্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে পানিনির ভাষ্যকার পতঞ্জলী কর্তৃক উলেস্নখ এ চিত্রকর্মেও প্রাচীনত্বেও প্রমাণ৷ বুদ্ধদেবের জীবনী ও পূর্বজন্ম সংক্রানত্ম জাতকের গল্প সম্বলিত পট মস্করী ভিৰুরা প্রদর্শন করতেন৷ সপ্তম শতাব্দীর গোড়ার দিকে রচিত হর্যচরিত ও অষ্টম শতকের মুদ্রারাৰসে পটুয়াদেও উলেস্নখ আছে৷ দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পটুয়ারা সক্রিয় ছিলেন৷ পনেরো শতকের কবিরা সংস্কৃত সাহিত্য হতে রাধা-কৃষ্ণ, রাম-সীতা প্রমুখের কাহিনী বাংলা ভাষায় পরিবেশন করেন৷ এ সব কাহিনী অবলম্বনে এ সময় কৃষ্ণলীলা, রামলীলা পটের প্রচলন হয় বলে অনুমিত৷ ষোড়শ শতাব্দীতে চৈতন্যদেবের বাণী প্রচাওে পট অঙ্কিত হয়৷ ঐ শতকের কবি মুকুন্দরামের কাব্যে পটের উলেস্নখ আছে৷
গাজীর পটের প্রবর্তনের কাল পনেরো শতক বলে অনুমান করা হয়৷ এ সময় পীরবাদেও প্রভাব দেখা যায়৷ ইসমাইল গাজী সুলতান বরবক শাহের ( ১৪৫৯ - ৭৪ ) ধর্মপ্রাণ কর্মচারী ও বীর যোদ্ধা ছিলেন৷ তিনি সুলতানের নির্দেশে উড়িষ্যা ও কামরূপ জয় করেন৷ ষোড়শ শতাব্দির শেষভাগে শেখ ফয়জুলস্নাহ তাঁর বীরত্ব ও আধ্যাত্মিকতা উপজীব্য কওে গাজী বিজয় রচনা করেন৷ কিংবদনত্মীর এ গাজী কেলে শাহ একদিল গাজী নামেও পরিচিত৷ সুন্দরবনের বাঘের নিয়নত্মা হিসাবে বাওয়ালী বা কাঠুরিয়া এবং মাওয়ালী বা মধু সংগ্রহকারীদেও বাঘবন্দী মন্ত্রে তাঁর নাম উচ্চারিত হয়৷
এক হাজার বছর আগে হতে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যনত্ম পটুয়ারা পট প্রদর্শন করতেন৷ বিগত শতাব্দী এমন কি বর্তমান শতকের গোড়ার দিকেও ঢাকা, নোয়াখালী, ময়মনসিংহ, রাজশাহী জবেং পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জেলাতে পটুয়া সঙ্গীতসহ পট চিত্র প্রদর্শণ করতেন বলে অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় সূত্রে জানা যায়৷
পট অঙ্কিত হতো কাপড়ের উপর৷ এরপর কাপড়ের উপর কাগজ লাগিয়ে মানচিত্রের মতো তা অাঁকা হতো৷ কাপড়ের উপর কখনো কেবল কাদামাটি কখনো গোবর মিশ্রিত প্রলেপ দিয়ে, তার উপর তেঁতুল বিচির আঠা বুলিয়ে চিত্রের জন্য মসৃন ও দীর্ঘস্থায়ী জমিন তৈরি করা হতো৷ ইটের গুঁড়ার সঙ্গে তেঁতুল বিচির আঠা মিশিয়েও জমিন তৈরী করা হতো৷ পট অাঁকা হয়ে গেলে পট শিল্পী নিজে সঙ্গীত সঙ্গতে তা প্রদর্শন করেন৷ বিক্রমপুর অঞ্চলে পট প্রদর্শনকে 'পট নাচান' বলা হয়৷ পটুয়াদের বহুমুখী প্রতিভার জন্য বলা হয় _ 'একাধারে ইহারা ভক্ত সাধক কবি গায়ক ও চিত্রশিল্পী অর্থাত্‍ একদেশদর্শী শিল্পী নন'৷ অবশ্য পটশিল্প ও তার প্রদর্শক কোনো কোনো ৰেত্রে ভিন্নও হন৷
বিষয়বস্তু এবং আকৃতির উপর ভিত্তি করে পটের শ্রেণীবিন্যাস করা হয়৷ ছোট আকৃতির একক চিত্র বিশিষ্ট পটের নাম 'চৌকা পট' এবং বহু চিত্র সম্বলিত পট 'দীর্ঘ পট' বা জড়ানো পট (ংপত্‍ড়ষষ) নামে পরিচিত৷ চৌকা পটের আয়তন দৈর্ঘ্যে এক ফুট বা কিছু অধিক, প্রস্থ ৬"_৮"৷ অজিতকুমার মুখোপাধ্যায়ের মতে, জড়ানো পট ১৫ হতে ৩০ ফুট লম্বা, ২ হতে ৩ ফুট চওড়া৷ যাদু পটুয়াদেও জড়ানো পট অপেৰাকৃত ছোট এবং পশ্চিম বঙ্গের সাঁওতাল এবং পূর্ববঙ্গেও বেদেদের (ুইবফরুধং ড়ভ ঊধংঃবত্‍হ ইবহমধষরচ্) কাছে তা প্রদর্শিত হয়৷
চৌকা পটের আওতায় আসে দু'রকমের পট ঃ চৰুদান পট ও কালিঘাটের পট৷ মৃত ব্যক্তির কল্পিত ছবি এঁকে পটুয়া তাতে চোখের তারা অবশিষ্ট রেখে প্রয়াত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজনের কাছে এসে চিত্রকর বলে, চোখের মনির অভাবে মৃত ব্যক্তি স্বর্গে যাবার পথ খুঁজে পাচ্ছে না৷ উপযুক্ত দর্শনী নিয়ে পটুয়া তার স্বর্গের দ্বার উন্মোচন করে৷ গুরম্নসদয় সংগ্রহশালায় কিছু চৰুদান পট রৰিত আছে৷ স্টেলা ক্রামরিশ এই পটুয়াদের বলেন 'যাদু পটুয়া'৷
অষ্টাদশ শতাব্দী হতে বিংশ শতাব্দির প্রথম ভাগ পর্যনত্ম কলকাতার কালিঘাট মন্দিরের দূরের অবস্থিত পটুয়া পাড়ায় কালিঘাটের পট নামে খ্যাত কাগজের উপর তুলির টানে অঙ্কিত চৌকা পটের প্রসার ঘটে৷ এ পটুয়ারা প্রথমে সূত্রধর পওে প্রতিমা শিল্পী এবং তার পওে পটশিল্পীতে রূপানত্মরিত হন৷ এসব ছবি সসত্মায় বিক্রয় হতো৷ দীনেশচন্দ্র সেন একখানা পটের দাম দু'পয়সা বলে উলেস্নখ করেন৷ এজন্য এগুলিকে "নধুধত্‍ ঢ়ধরহঃরহমং" বলা হতো৷ ুঞযব ঢ়ধরহঃরহমং ধহফ নত্‍ঁংয ফত্‍ধরিহমং ধত্‍ব সড়হঁসবহঃধষ রহ ঃযবরত্‍ ত্‍বঢ়ত্‍বংবহঃধঃরড়হ ড়হ ড়ঃযবত্‍রিংব সড়ংঃষু নষধহশ ঢ়ধমব.চ্ বলেন স্টেলা ক্রামরিশ৷
কালিঘাটের পট আজ বিলুপ্ত৷ পটুয়ারা আবার মূর্তি পুতুল গড়ার পেশা গ্রহণ করেছেন৷ আনুমানিক ষাট বছর বয়স্ক শীশচন্দ চিত্রকর (পাল) একমাত্র ব্যতিক্রম৷ এ লেখকের সঙ্গে ১৯৮৭ সালের ২৭শে জুন এক সাৰাত্‍কারে তিনি বলেন, সরকারের ইচ্ছা একটি প্রশিৰণ কেন্দ্র খুলে তিনি আবার পটুয়া গোষ্ঠী গড়ে তুলুন৷ কিন্তু তাতে প্রশিৰণ প্রাপ্তদের পেটের ভাত জুটবে কিনা সে বিষয়ে তিনি সন্ধিহান৷
বিষয়ভিত্তিক শ্যেণীবিন্যাসে আছে চন্ডীপট, শক্তিপট, দশ অবতার পট, রামলীলা পট, কৃষ্ণলীলা পট, মনসাপট, যমপট ও গাজীর পট৷ চৰুদান পট আর যাদু পটও এ শ্যেণীর আওতাভুক্ত৷ নাম হতে পটগুলির বিষয়বস্তু অনুমান করা হয়৷ কাহিনী চিত্র সম্বলিত জড়ানো পটের শেষের দিকে কয়েকটি প্যানেলে পরকালে পাপাচারীদেও যমের দেয়া শাসত্মির কিছু চিত্র তুলে ধরা হয়৷ তাই এর নামকরণ যমপট৷ তাতে নৈতিক অধঃপতন রোধের চেষ্টা দেখা যায়৷ পঞ্চকল্যাণী পট নামক এক পটের উলেস্নখ করেন আশুতোষ ভট্টাচার্য৷ তাতে একক কোনো দেবদেবীর লীলা অঙ্কিত না হয়ে বিভিন্ন দেবদেবীর এক একটি লীলা অঙ্কিত৷ এ পটের জমিন অবশ্য মৃত্‍পাত্র এবং তার শিল্পী কুম্ভকার৷ উলেস্নখ্য যে; পট অনেক সময় বিগ্রহের বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়৷ ব্যবসায়ীরা এককালে তাঁদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পট ঝুলাতো বলে জানা যায়৷
"জড়ানো পটের উত্‍স নিশ্চিতভাবেই অজানত্মার দেয়ালচিত্র৷ ঐ চিত্রের নিকটতম প্রতিবেশী অন্ধ্র স্কুল"৷ বলেছেন বোরহানউদ্দিন খান ঝাহাঙ্গীর৷ কল্যাণকুমার গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, অষ্টাদশ শতাব্দীর রাজধানী বিশেষ করে জয়পুর ধারা এবং ঐ সময়কার মোগল চিত্রকলার কিছু প্রভাব এই শিল্পে দেখা যায়৷ বিনয় ঘোষ পটের বলিষ্ঠ রেখায় মুসলিম ক্যালিগ্রাফী বা হসত্মলিপির প্রভাবের কথা উলেস্নখ করেন৷ অমিয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, "উলেস্নখিত শিল্পধারার অনুরূপ কোনো দরবারী অঙ্কন রীতি বঙ্গদেশে বিকশিত না হলেও রঙ্গিন পট, পুঁথি ও পুঁথির পটচিত্রে অনত্মত পাল রাজাদেও কাল হতে এখানে একটা নিজস্ব শিল্পরীতে গড়ে ওঠে৷ উভয়েই বাঙালি মনীষার নিজস্ব সৃষ্টি, নিকট বা দূরের রীতি দ্বারা প্রভাবিত নয়"৷ এ পদ্ধতিটিট দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি৷
চিত্রশৈলী সম্পর্কে ওয়াকিল আহমদের ধারণা বিরূপ৷ "পটচিত্রের সূ্থল রেখার কায়া আছে সূৰ রঙ্গেও মায়া নেই"৷ এ মতের বৈপরীত্ব দেখা যায় কল্যাণকুমার গঙ্গোপাধ্যায়ের উক্তিতে _ ুঞযব ঢ়ধঃধং ধত্‍ব ভষধঃ রহ ঃত্‍বধঃসবহঃ নঁঃ ঃযবরত্‍ ষধহমঁধমব রং নবংঃ ঁহফবত্‍ংঃড়ড়ফ রহ ঃযব ারমড়ত্‍ড়ঁং ধহফ ংবিবঢ়রহম ড়ঁঃষরহবং ধহফ রহঃবহংবষু ড়িত্‍স পড়ষড়ত্‍.চ্৷
বিশেষ কওে কালিঘাটের পট সম্পর্কে অজিত মুখোপাধ্যায়ের সাধুবাদেও ভাষা হলো ুঃযব ষরহবং ধত্‍ব ফরংঃরহপঃষু নড়ষফ ংরিভঃ ধহফ ধঃঃত্‍ধপঃরাবচ্. সংযোজিত কলিঘাটের পটটি তার প্রমাণ৷ গ্রামবাংলার সহজ সরল জীবনের সার্থক প্রতিফলন ঘটে এ লোকশিল্পীদের সাধারণ তুলির টানে৷ দ্বিমাত্রিক ও সমতলভিত্তিক পটচিত্রে গতি আনয়ন করে তার বলিষ্ঠ রেখা আর রঙের উষ্ণতা৷ স্বাভাবিক আলোকে প্রদর্শিত হয় বলে পটের রং সাধারণত উজ্জ্বল৷ নাটকীয়ভাবে সঙ্গীত সঙ্গতে তার প্রদর্শন গুটান চিত্রে যেটুকু অপূর্ণতা থাকে, তা মোচন করে৷ বিষয় নির্বাচন, দৃশ্য নির্মাণ ও উপস্থাপনার কোনো ধরা বাঁধা নিয়ম নেই৷ স্বাভাবিক দৰতায় তাঁরা চিত্রাঙ্কন করে থাকেন৷
ড.সুকুমার সেন তাঁর "ইসলামী বাংলা সাহিত্য" গ্রন্থে উলেস্নখ করেন যে, উভয় বঙ্গের মধ্যে কেবল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশুতোষ মিউজিয়ামে একটি মাত্র গাজীর পট আছে৷ সম্প্রতি অবশ্য সে সংগ্রহশালা এবং গুরম্নসদয় দত্ত মিউজিয়ামেও একাধিক গাজীর পট সংগৃহীত হয়েছে৷
ফোর্ড ফাউন্ডেশন ও কারিকার যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত লোক কারম্নশিল্প জরিপ প্রকল্পের আওতায় গ্রাম পরিক্রমায় মোহনগঞ্জ হতে নরসিংদীর গাজীর পট প্রদর্শণীতে কোনাই মিয়ার খবর পেয়ে তার কাছে সুধীর আচার্য়েও হাতে অাঁকা একটা গাজীর পটের সন্ধান পাওয়া যায়৷ কোনাই মিয়ার সহায়তায় আমরা শিল্পী সুধীরচন্দ্রের সাৰাত্‍ লাভ করি৷ এভাবে সারা জীবনের নীরব সাধক এ পটশিল্পী আবিষ্কৃত হন৷
মুন্সীগঞ্জ জেলায় কাঠপট্টির কালিন্দীপাড়ায় আশ্রমসম গৃহে সুধীর আচার্যের নিবাস৷ ১৩১৯ সালের ৯ই চৈত্র তাঁর জন্মতারিখ৷ তাঁর বিশ বত্‍সর বয়সে পিতা প্রাণকৃষ্ণ আচার্য পরলোক গমন করেন৷ পিতামহ রামসুন্দর আচার্য এবং প্রপিতামহ রামগোপাল আচার্য সবাই ছিলেন পটশিল্পী৷ তাঁর আটাশ বছর বয়স্ক পুত্র শম্ভূনাথ আচার্যও একজন চিত্রকর৷ তিনি নারায়নগঞ্জের একটি বিদ্যালয়ে কমার্মিয়াল আর্টে শিৰা লাভ করেন৷ তাঁর রীতি ঐতিহ্যাশ্রয়ী নয়৷ পরিবারের প্রাচীন ধারাটি অৰুন্ন রাখার জন্য তাঁকে অনুরোধ জানানো হয়েছে৷ তন্তুরায় অধু্যষিত নরসিংদীতে এ পরিবারটি আট পুরম্নষ হতে তাঁতের শাড়ির পাড়ের নকশা অাঁকেন৷ সুধীর আচার্য জ্যোতিষ শাস্ত্রেও পারদর্শী৷ সব সম্প্রদায়ের লোক তাঁর আসত্মানায় আসেন গণনা ও ঝাড়ফুঁকের জন্য৷
পট অঙ্কনে তাঁর রীতি হলো, প্রথমে ইটের গুঁড়া কাপড় দিয়ে চেলে নেয়া৷ পাতলা কাপড়ে তা ছেঁকে তেঁতুল বিচির কষ বা আঠা দিয়ে গুলে একখানা গামছার উপরে তিনবার ও নীচে দু'বার তা লাগাতে হয়৷ পাউডার রঙ দিয়ে সাধারণ তুলির সাহায্যে ক্যানভাসের উপর সুধীর আচার্য পট আাঁকেন৷ মাটির উপর গামছা বিছিয়ে পট অঙ্কন করা হয়৷
লেখকের ব্যক্তিগত সংগ্রহে তাঁর অঙ্কিত যে পটটি আছে তার পরিমাপ ৪'-১০'*২',কয়েকটি প্যানেলে ভাগ কওে তার উপর লাল, নীল, হলুদ, সবুজ, গোলাপী, বাদামী, সাদা ও কালো রঙ লাগিয়ে ছবি অাঁকা হয়েছে৷ মাঝখানে আছে ৪'-১০*১'-৪" মাপের একটি বড় ছবি৷ তার উপরে ও নিচে তিন সারি ছবি৷ প্রতি সারিতে তিনটি কওে চিত্র অাঁকা৷ একেবারে নিচের সারিতে মাঝখানে দু'টি পিলার বা খামের ওপর তিনটি করে চিত্র অাঁকা আর্চ বা তোরণের নিচে তিনটি ছবি৷ এটিকে একটি ছবি ধরলে চিত্রের সংখ্যা দাঁড়ায় তেইশ, তিনটি ধরলে পঁচিশ৷ মাঝের বড় ছবিতে বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে আছেন গাজী পীর৷ তাঁর এক হাতে চামর, অপর হাতের মুষ্টি ঘিওে জ্যোতি৷
গাইন নামে পরিচিত গাজীর গানের গায়কদেও হাতে এ চামর ও আশা বা আশাদানা থাকে৷ তিনি আসা বা লাঠি মাটিতে পুঁতে তাঁরা হিন্দু মুসলমানদেও বাড়ি বা সমাবেশে মন্ত্রবত্‍ গাজীর গান পাঁচালি উচ্চারণ করেন৷ মানুষের মাথার উপর আসা বুলিয়ে তাদেও মঙ্গল কামনা করেন৷
বড়চিত্রের বাঘের সামনে ও পিছনে দ'জন লোক, একজনের হাতে কালো রঙের ত্রিকোণাকার পতাকা, একজন ধরেছে গাজীর মাথায় ছাতা৷
সুধীর আচার্য ছবিগুলির পরিচয় দিয়েছেন এভাবে উপরের বাম কোণ হতে (১) মকরবাহী গঙ্গা (২) ঘোড়া ও সহিস (৩) পুইস্কার বাবা মা (মাঝে হুক্কা) (৪) হরিণ জবাই, (৫) নাকাড়ায় বাড়ি ও (৬) গাজীর আসা (৭) চৈতার মা চিড়া কুটে, (৮) শিমূল গাছ, (৯) সওদাগরের বাণিজ্য যাত্রা, (১০) আন্দুরা বাঘ, (১১) গাজীর ছাতার দু'পাশে দু'টি টিয়া পাখি, (১২) খান্দুরা বাঘ, (১৩) উপরে উলিস্নখিত মাঝখানের বড় প্যানেল, (১৪) কুমিরের সওয়ার (১৫) লৰীদেবীর সিঁদুরের কৌটা, (১৬) স্বামী চুল ধরে মারে, (১৭) গোয়ালার গাভী নিলো বাঘে, (১৮) খোঁপা মাথায় নারী, (১৯) স্ত্রীলোককে বাঘে আক্রমণ, (২০) বৰিলা উল্টা করে বাঁধা, (২১) চরখায় সূতা কাটা, (২২) দধির ভারসহ গোয়ালা, (২৩) যমদূত, (২৪) যম রাজার মা, (২৫) কালদূত৷
নিচের তিনটি চিত্রের সংযোজন ইঙ্গিত করছে গাজীর পট হয়েও এটি একটি যমপট৷ কোনাই মিয়া অনুরূপ একটি পুরো পট প্রদর্শন করেন৷ প্রাসঙ্গিক পটুয়া সঙ্গীতে যম সম্পর্কিত তাঁর গানের পয়ার নিম্নরূপ _
যমদূত কালদূত ডাইনে আরো বায়৷
মধ্যখানে বইসা আছে যমরাজের মায়৷
যমদূত কালদূত দেইখ্যা লইবেন তারে
দুই হাতে দুই লোহার গদা যমের মতো ফিরে৷
যমরাজের মায় বইছে তামার ডেকচি লইয়া
অতি পাপী মানুষের কলস্না দিছে সে ডেগে ফালাইয়া৷
এই ছিলো কোনাই মিয়ার গানের সমাপ্তি৷ এর শুরম্ন গাজীকে নিয়ে৷
ধুয়া :
গাজীর নাম কেন লইলা নারে দেহের গুমান করে৷
দম দম বলিয়া মন দমে করি হিতি
এই দম ফুরাইয়া গেলে কি লইয়া বসতি৷
গাজীর বাপের নাম শাহ সেকান্দর৷
রওনক শহরে বানছে মদিনা বাড়ীঘর৷
পাতাল জিন্দা করে বিয়া বলিরাজের বেটা৷
সে ঘরেতে জন্ম নিল পীর জিন্দা গাজী৷
এ হলো কিংবদনত্মীর গাজীর বংশ পরিচয়৷ মাঝখানের বড় চিত্রের দু'টি লোকের পরিচয় মিলে কোনাই ব্যাপরীর পয়ারে৷
লোকঐতিহ্যের দশ দিগনত্ম
গাজীর ভাই কালু ছাতা ধরিলো
গামনেতে মানিকপীর নিসান ধরিলো৷
কালু গাজীকে তাঁর অলৌকিক ক্রিয়া প্রদর্শনের জন্য অনুরোধ জানান _
একযুগ বারো বছর রইলাম বনে বনে
কি ফকিরী পাইলা ভাই দেখাও আমারে৷
বারো বছর ধওে একটি শিমুল গাছ মওে আছে৷ সে গাছকে পুনর্জীবিত না করতে পারলে কালু তার সঙ্গ ছাড়বে৷
বিছমিলস্নাহ বলিয়া গাজী গাছে রাখে হাত৷
গাজীর দোয়ায় বাইচ্চা উঠে মরা শিমুল গাছ৷
ডশমুল গাছের অঙ্কন সরল৷ মাঝে কা-, দু'পাশে তিনটি কওে ছয়টি প্রশাখাহীন শাখা, তাদেও মাথায় এক একটি অনত্মর ফুল ও পাতা৷
পটুয়া সঙ্গীতটি চারটি অংশে বিভক্ত _ গাজীর অলৌকিক শক্তি, কিছু হিতোপদেশ, কিছু 'রঙের কথা', পরিশেষে যম৷
হিতোদেশের নমুনা :
রান্ধিয়া বান্ধিয়া অন্ন পুরম্নষের আগে খায়
ভরানা কলসের পানি তিরাসে ফুরায়৷
* * *
দুব দুবাইয়া হাটে নারী চোখ গোরাইয়া চায়৷
অলৰীওে দিয়া ঘরে লৰী লইয়া যায়৷
কিছু রঙ্গরস :
চুলনা বুড়ি চুলের লাগি কান্দে
কচুর পাতা দিয়া তার খোপা বড় করে৷
* * *
আটতে জানে না বুড়ি চিবি গুয়া খায়
ডবয়া সাদীর কথা শুনলে তুর তুরাইয়া যায়৷
পটুয়ারা পট দিয়ে বাড়িতে বাড়িতে পট দেখিয়ে পারিশ্রমিক হিসেবে ধান পায়৷ পটের মালিক একজন মহাজন বেদে৷ গায়ক গরীব বেদে৷ পটের জন্য তিন ভাগের এক ভাগ পায় মহাজন বেদে, গানের জন্য পায় দু'ভাগ৷ দুই যুগ আগে এ ছিলো ব্যবস্থা৷ এ তথ্য পাওয়া যায় সুধীর আচার্যের কাছে৷ এখন ধরতে গেলে পট তৈরী হয়ই না৷ বছরে চার পাঁচটা এখন বিক্রি হয়৷
ধর্ম ও নীতিজ্ঞানভিত্তিক সমাজের অবৰয় পটের বিলুপ্তির অন্যতম কারণ৷ পাশ্চাত্য শিল্পরীতিতে অঙ্কিত চিত্রের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পট টিকে থাকতে পারেনি৷ পট এককালে বিনোদনের মাধ্যমও ছিলো৷ এ ৰেত্রে এসেছে বৈপস্নবিক পরিবর্তন৷ ম্যাজিক ল্যানটার্ন এলো, নির্বাক সবাক চলচ্চিত্র এলো, এলো টেলিভিশন, ভিসিআর, ভি,সি,পি, ভিডিও ক্যামেরা৷ গুঁড়িয়ে দিলো লোকচিত্রের ঐতিহ্যকে৷ সুধীর আচার্য সে বিধ্বসত্ম অতীত এবং তার এক ৰীণ রেশের মধ্যে বন্দী৷ কালিঘাটের পটুয়া শ্রীশচন্দ্র চিত্রকর পেলেন সে দেশের রাষ্ট্রপতির পুরস্কার৷ সুধীরচন্দ্র আচার্যকে আমার জ্ঞাপন করছি আমাদেও প্রতিষ্ঠানের সামান্য স্বীকৃতি৷

No comments:

Post a Comment