Friday, 20 November 2009

মেসোপটেমিয়ান আর্ট

মেসোপটেমিয়া একটি গ্রীক শব্দ। এর অর্থ দুই নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল। এই দুই নদী বলতে টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিসকে বোঝানো হয়েছে।

প্রাচীন সভ্যতার দিক হতে মিশরের পর মেসোপটেমিয়ার নাম করা যায়। তবে মিশর এবং মেসোপটেমিয়া সভ্যতা সমসাময়িক বলে ধারনা করা হয়। এ সভ্যতাকে আগে ব্যবিলনীয় বা ব্যবিলনীয় আসিরীয় নামে আখ্যায়িত করা হতো। মেসোপটেমিয়ার উত্তরাংশের নাম আসিরিয়া ও দক্ষিনাংশের নাম ব্যবিলনীয়া। ব্যবিলনিয়ার দুটি অংশ - দক্ষিনে সুমের ও উত্তরে আক্কাদ। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল হতে মানুষ এখানে এসে আবাস গড়ে তুলেছিলো। নব্যপ্রস্তর যুগের যাযাবর মানুষ আশ্রয়ের সন্ধানে এখানে এসে উপস্থিত হয়। সুমেরীয় ব্যবিলনীয় কাসাইট, আসিরীয়, ক্যলিডীয় প্রভৃতি জাতির অবদানে দীর্ঘকাল এ সভ্যতা সমৃদ্ধ হয়েছিলো। তাই সামগ্রিকভাবে এ সভ্যতাকে মেসোপটেমিয়া সভ্যতা বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত।

মেসোপটেমিয়ায় প্রথমে যারা সভ্যতার গোড়াপত্তন করে তারা সুমের জাতি। সুমের জাতি কয়েকটি নগরীর গোড়াপত্তন করে। সুমেরের পরে আসে আক্কাদ জাতি। আক্কাইদ জাতির পর আমেরাইট জাতির আবির্ভাব ঘটে। আমেরাইট জাতির বিখ্যাত সম্রাট ছিলেন হাম্বুরাবি। তার রাজধানীর নাম ছিলো ব্যবিলন। আমেরাইটের পরে মেসোপটেমিয়ায় আগমন করে আসিরীয় জাতি।

মেসোপটেমিয়ায় জাতিসত্ত্বার গোড়াপত্তন : মেসোপটেমিয়ার পলিমাটি পড়া টাইগ্রিস এবং ইউফ্রেটিস নদী বিধৌত অঞ্চলই ছিলো খুব উর্বর। এ অঞ্চলে খাদ্যের প্রাচুর্য যাযাবর গোষ্ঠীর স্থিতিশীলতা এনে দেয়। ক্রমে জনসংখ্যাও বেড়ে যেতে থাকে। এখানকার আবহাওয়া সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলবার সহায়ক ছিলো। এ অঞ্চলের মানুষ মৃত্যু পরবর্তী জীবন নিয়ে বিশেষ ভাবেনি। তারা বুঝতো পার্থিব জীবনের সুখ আর আনন্দ। তারা যুদ্ধ ও শিকার করতে ভালোবাসতো। মেসোপটেমিয়ায় তাই শিকার ও যুদ্ধের প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ্যনীয়।

সুমেরীয় শিল্পকলা : মেসোপটেমিয়ায় প্রথমেই যারা সভ্যতার গোড়াপত্তন করে, তারা সুমের জাতি। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস এই দুটি নদী বেষ্টিত সুমের ছিলো কাদামাটির অঞ্চল। সুরক্ষিত শহর নির্মানে তারা ছিলো দক্ষ।

সুমেরিয়ান সংস্কৃতির একটি বিরাট বিষয় হলো জিগুরাট। অর্ম মন্দিররূপে জিগুরাতের অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চতুষ্কোন ভিতই এর প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রথম জিগুরাত নির্মিত হয়েছিলো উড় নামক শহরে। এটি সাদা মন্দির নামে খ্যাত। জিগুরাত নির্মানে সাধারনতঃ উপকরন হিসেবে রোদে পোড়া ইট ব্যবহৃত হত।

ভাস্কর্য নির্মানে সুমেরীয়রা দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। সুমেরীয়ান ভাস্কর্যের বৈশিষ্ট্য বড় বড় চোখ ও সিলিন্ডার আকৃতির দেহ পরিলক্ষিত হয়। খৃঃ পূঃ ৩৫০০ অব্দে মার্বেল পাথরে নির্মিত নারী মুর্তিটি অসম্ভব অভিব্যক্তিময়। এর ঠোঁট ও চিবুকের স্নিগ্ধ সৌন্দর্য চোখে পড়ে।

সুমেরীয়ান ভাস্কর্যের মধ্যে অন্যতম টেল-আসমারে আবুর মন্দির হতে উক্ত পুজারীদের কতগুলি মুর্তি। মুর্তিগুলির সবকটি উপাসনার ভঙ্গিতে দন্ডায়মান। এগুলি ঘাঘরা সদৃশ পোষাক পরিহিত। পুরুষ মুর্তির লম্বা ও কুঞ্চিত চুল ও দাড়ি সম্পূর্ণ কামানো।

আক্কাদীয় শিল্পকলা : দক্ষিন মেসোপটেময়ায় উরুক যুগের প্রথম দিকে সুমেরীয়রা আসে। সেই সময় বা তারও পূর্ব হতে টাইগ্রিস নদীর উচ্চ অববাহিকা অঞ্চলে সেমেটিক জাতির মানুষের বাস ছিলো যারা কালক্রমে আক্কাদীয় সম্রজ্যের প্রতিষ্ঠা করে। রাজা সারগন ছিলেন এই সম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা। বিভিন্ন ভাস্কর্য হতে আক্কাদীয়দের আকৃতি সম্বন্ধে ধারনা করা যায়। তাদের মুখে সাধারনতঃ দাঁড়ি ও মাথার চুল ঘাড় পর্যন্ত লম্বা ছিলো।

আক্কাদিয় যুগের স্থাপত্য সম্বন্ধে খুব বেশী তথ্য আবিষ্কৃত না হলেও বহু ভাস্কর্যের নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। ভাস্কর্যগুলো সাধারনতঃ ব্রোঞ্জ ও পাথর দিয়ে তৈরী হতো যা ছিলো খুবই উন্নত। ভাস্কর্যগুলোর রূপ ছিলো পার্থিব।

খৃঃ পূঃ ২২০০ অব্দে নির্মিত আক্কাদীয় শাসকের ব্রোঞ্জ মুর্তিটি এ সময়ের শিল্পকলার একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন। এর মুখের অভিব্যক্তিতে ছিলো আতœপ্রত্যয় ও পৌরুষদীপ্ত ভাবের প্রকাশ। এর মুখে ছিলো লম্বা দাঁত, চুল ঘাড়ের কাছে বাঁধা, চোখের গর্তে পাথর বসানো।

মার্গনের পুত্র নরমইসনের বীরত্ব কাহিনী বর্ণিত পাথরের একটি খন্ড আক্কাদীয় শিল্পের বিশিষ্ট উদাহরন (ভিক্টরিস টেল অফ নরম সিন ফ্রম সুসু, ২২০০খৃঃ পূঃ, পিঙ্ক, স্যান্ডস্টোন). এই খন্ডটি প্রায় ৭৫ ফুট উঁচু। এর গায়ে যুদ্ধ দৃশ্য উৎকীর্ণ। এতে রাজা নারামসিন তীর ধনুক হাতে পাহাড়ে উঠছেন সৈন্যদল নিয়ে। রাজাকে এখানে বড় করে দেখানো হয়েছে যা মিশরীয় শিল্পকলার অনুরূপ।

নিও সুমেরিয়ান শিল্পকলা : উত্তর পূর্ব দিক হতে আগত গুটি নামে এক বর্বর জাতির আক্রমনে আক্কাদীয় সাম্রাজ্যের পতন হয়। এ জাতির একজন শাসকের নাম ছিলো গুতিয়া। তার অসংখ্য ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছিলো। এগুলোর বেশীর ভাগই দাড়ানো বা উপষ্টি অবস্থায়।

খৃঃ পূঃ ২১০০ অব্দে উপবিষ্ট অবস্থায় রাজা গুতিয়ার একটি ভাস্কর্য পাওওয়া যায় যা কঠিন ডিওরাইট পাথরে তৈরী। এতে রাজাকে একজন পূজারীরূপে দেখানো হয়েছে।

ব্যাবিলনীয় শিল্পকলা : সুমেরীয়দের পতনের পর আমেরাইট জাতি সুমের ও আক্কাদ জয় করে ব্যাবিলনীয় সভ্যতা গড়ে তোলেন। আমেরাইটদের নিজের সংস্কৃতি বিশেষ উন্নত ছিলো না, তারা মেসোপটেমিয়ার সম্রাজ্য পতন করে সুমেরীয়দের সভ্যতা সংস্কৃতিকেই গ্রহন করেছিলো। খৃঃ পূঃ ১৭৯২ - ১৭৫০ অব্দের মধ্যে ব্যবিলনের রাজা হাম্বুরাবি গোটা মেসোপটেমিয়াকেই ব্যবিলনের এককেন্দ্রীয় শাসনব্যবস্থার অধীনে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার সাম্রাজ্য বিরাট ছিলো।

আসিরিয় শিল্পকলা : টাইগ্রিস নদীর উচ্চ ববাহিকা অঞ্চলে বহু প্রাচীনকাল হতে একটি জাতি বাস করতো। তাদের প্রধান দেবতা ছিলো অসুর। অসুর দেবতার নামানুসারে সেই জাতি আসিরিয় নামে পরিচিত।

মেসোপটেমীয় অন্যান্য নির্মাণের মতো আসেরীয়রাও নির্মানের উপকরন হিসেবে কাদামাটির ইট ব্যবহার করতো। এ সময়ের অধিকাংশ ভাস্কর্যই ছিলো রিলিফ ভাস্কর্য। এ সময়ের ভাস্কর্যগুলোতে হিংস্রভাব প্রকাশ পেয়েছে। মানুষের সমস্ত সুকোমল বৃত্তিকে নির্মাতিত করে আসিরীয় সম্রাটগন রাক্ষুসে বা রক্তলোলুপ ভাবটিকে তীব্রভাবে প্রকাশ করার জন্য যেন শিল্পীদের নিযুক্ত করেছিলেন। ভাস্কর্যগুলোর অভিব্যক্তিতে কঠোর ও অনমনীয় ভাব। এসব ভাস্কর্যের অভিব্যক্তিতে প্রকাশ পেয়েছে উদ্ধত প্রকৃতির শাসকের ক্ষমাহীন বা নির্মম ভাব।

আসিরীয়রা ছিলো মহাপরাক্রান্ত এবং রণকৌশলে নিপুন। আসিরীয় সম্রাটগন যুদ্ধক্ষেত্র এবং শিকারের কাহিনীকে তাদের কলাকৌশল এবং বীরত্বের কাহিনীকে প্রাসাদের গায়ে ভাস্কর্য ও চিত্রকলার মাধ্যমে রূপদিতে শিল্পীদের নির্দেশ দেন। তাই যুদ্ধক্ষেত্র এবং শিকারের দৃশ্যপট আসিরীয় শিল্পের মুল উপজীব্য।

আসিরীয়ান ভাস্কর্যের অন্যতম নিদর্শন মেলে খৃঃ পূঃ ৭২০ অব্দে। এ সময়ে নির্মিত ভাস্কর্য লামাস্সু তে অদ্ভুত আকৃতি লক্ষ্যনীয়। এর মুখমন্ডল মানুষের মতো এবং দেহকানেডর আকার সিংহের মতো। পিঠের উপরে ঈগলের পাখাযুক্ত।

“ডাইং লায়নস” নামক ভাস্কর্যটিতে বানবিদ্ধ মরোম্মুখ একটি সিংহী অঙ্কিত হয়েছে। এর তুলনা বিশ্বের শিল্পভান্ডারে দুর্লভ। তিনটি বান সিংহীর পৃষ্ঠদেশ ভেদ করে চলে গিয়েছে। তবু সে দেহেরে সমস্তভার ন্যস্ত করে সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছে। এখানে আহত সিংহীর বাঁচার জন্য চোখে ফুটে উঠেছে তার অসহায়ত্ব।

No comments:

Post a Comment